ঢাকা | বঙ্গাব্দ

ভোলাহাটে আমের ফেলে দেওয়া খোসা থেকে তৈরি হচ্ছে ‘ম্যাংগো পিল টি’, তিন বন্ধুর ব্যতিক্রমী উদ্ভাবন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 26, 2026 ইং
ভোলাহাটে আমের ফেলে দেওয়া খোসা থেকে তৈরি হচ্ছে ‘ম্যাংগো পিল টি’, তিন বন্ধুর ব্যতিক্রমী উদ্ভাবন ছবির ক্যাপশন: দৈনিক চেতনার কন্ঠ
ad728
ফেলে দেওয়া আমের খোসা কাজে লাগিয়ে মাসে আয় ৪০-৫০ হাজার টাকা, দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হচ্ছে প্রক্রিয়াজাতকরণের যন্ত্র

মোঃ রনি রজব, স্টাফ রিপোর্টার

  1. চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার সীমান্তবর্তী বজরাটেক এলাকায় আমের ফেলে দেওয়া খোসা থেকে তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু ও সুগন্ধিযুক্ত ‘ম্যাংগো পিল টি’ বা আমের খোসার চা। একসময় যে খোসা বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া হতো, সেই খোসাকেই বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তর করে চমক সৃষ্টি করেছেন তিন তরুণ উদ্যোক্তা। তাদের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ শুধু স্থানীয় মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি, বরং আমের অবশিষ্টাংশ কাজে লাগিয়ে নতুন সম্ভাবনার দুয়ারও খুলে দিয়েছে।

  2. এই উদ্ভাবনী উদ্যোগের পেছনে রয়েছেন তিন বন্ধু—মোঃ মাইনুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী; মোঃ মিঠু, একজন সরকারি চাকরিজীবী; এবং এ. বান্না মাসুম, একজন আইটি ব্যবসায়ী। তিনজন মিলে গড়ে তুলেছেন ‘সবুজ খাবার’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে তারা আম থেকে তৈরি করছেন ড্রাই ম্যাংগো, আমের পাউডার এবং আমের খোসা থেকে বিশেষ ধরনের চা।

  3. ২০২২ সালের সংকট থেকে নতুন উদ্যোগের সূচনা

  4. উদ্যোক্তারা জানান, ২০২২ সালের আম মৌসুমে আমের দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ার ঘটনা তাদের নতুনভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। সে সময় অনেক কৃষক উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে বিপাকে পড়েন। বিক্রি করতে না পেরে কেউ কেউ গবাদিপশুকে আম খাওয়াতে বাধ্য হন। লোকসানের আশঙ্কায় কিছু আমচাষী আমগাছ কেটে ফেলার কথাও ভাবতে শুরু করেন।

  5. চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের ঐতিহ্য এবং আমচাষীদের এমন সংকট তাদের গভীরভাবে নাড়া দেয়। আমের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করে কৃষকদের জন্য নতুন বাজার তৈরির চিন্তা থেকেই তারা প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ে কাজ শুরু করেন।

  6. প্রথমদিকে ২০২২ সাল থেকে তারা শুকনো আম বা ড্রাই ম্যাংগো এবং আমের পাউডার তৈরি শুরু করেন। কিন্তু ড্রাই ম্যাংগো তৈরির সময় বিপুল পরিমাণ আমের খোসা ফেলে দিতে হতো। সেই খোসাকে কাজে লাগানোর চিন্তা থেকেই তারা বিভিন্ন তথ্য অনুসন্ধান শুরু করেন। একপর্যায়ে জানতে পারেন, আমের খোসা প্রক্রিয়াজাত করে চা তৈরি করা সম্ভব। এরপর পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করেন ‘ম্যাংগো পিল টি’ তৈরির কাজ। ধীরে ধীরে তাদের এই পরীক্ষামূলক উদ্যোগ বাণিজ্যিক রূপ পেতে শুরু করে।

  7. দেশীয় প্রযুক্তিতে যন্ত্র তৈরি, কমেছে উৎপাদন খরচ

  8. উদ্যোক্তাদের এই উদ্যোগের অন্যতম সাফল্য হলো দেশীয় প্রযুক্তিতে আম শুকানোর যন্ত্র তৈরি করা। তারা জানান, আম শুকানোর জন্য প্রয়োজনীয় উন্নতমানের মেশিন চীন থেকে আমদানি করতে প্রায় ১১ লাখ ৭০ হাজার টাকা খরচ হতো। কিন্তু নিজেদের মেধা, দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত চিন্তাকে কাজে লাগিয়ে মাত্র ৫ লাখ টাকা ব্যয়ে দেশীয় প্রযুক্তিতে একই ধরনের কাজের উপযোগী একটি মেশিন তৈরি করেন তারা।

  9. এর ফলে যন্ত্র তৈরির খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন। তাদের মতে, স্থানীয়ভাবে প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও ব্যবহার করা গেলে উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্যও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

  10. যেভাবে তৈরি হচ্ছে ম্যাংগো পিল টি

  11. উদ্যোক্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এক কেজি ম্যাংগো পিল টি তৈরি করতে প্রায় ১৪ কেজি আমের খোসা প্রয়োজন হয়। চা তৈরির জন্য প্রথমে বাজার থেকে ভালো মানের আম সংগ্রহ করা হয়। এরপর আমগুলো ভালোভাবে পরিষ্কার করে খোসা ছাড়ানো হয়।

  12. সংগ্রহ করা খোসাগুলো নিজস্ব তৈরি মেশিনে প্রায় চার থেকে পাঁচ দিন ধরে শুকানো হয়। খোসাগুলো সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেলে ব্লেন্ডার মেশিনের সাহায্যে প্রক্রিয়াজাত করে চায়ের উপযোগী নির্দিষ্ট আকৃতি ও দানায় রূপ দেওয়া হয়। এভাবেই প্রস্তুত হয় আমের খোসা থেকে তৈরি ব্যতিক্রমী চা।

  13. পরবর্তী সময়ে গরম পানিতে প্রয়োজনমতো চা মিশিয়ে পানীয়টি তৈরি করা যায়। উদ্যোক্তাদের দাবি, এ চায়ের স্বাদ ও সুবাস গ্রাহকদের আকৃষ্ট করছে। তবে এর পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্যগত উপকারিতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন।

  14. প্রতি কেজি চায়ের দাম দুই থেকে চার হাজার টাকা

  15. বর্তমানে ‘সবুজ খাবার’ প্রতিষ্ঠানটি দুই ধরনের ম্যাংগো পিল টি বাজারজাত করছে। এর মধ্যে ‘ম্যাংগো পিল গোল্ড টি’র প্রতি কেজির দাম ৪ হাজার টাকা। অন্যদিকে ‘ম্যাংগো পিল ডার্ক টি’র প্রতি কেজির দাম ২ হাজার টাকা।

  16. উদ্যোক্তারা জানান, গোল্ড টি গ্রাহকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। স্থানীয় বাজারে বিক্রির পাশাপাশি অনলাইনেও তারা পণ্য বিক্রি করছেন। ফেসবুকে ‘সবুজ খাবার’ পেজের মাধ্যমে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে তাদের তৈরি এই চা।

  17. তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু আমের খোসা থেকে তৈরি চা বিক্রি করেই বর্তমানে মাসে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় হচ্ছে। অনলাইনে নিয়মিত অর্ডার পাওয়ায় ভবিষ্যতে ব্যবসার পরিসর আরও বাড়ানোর সম্ভাবনা দেখছেন তারা।

  18. আমের প্রতিটি অংশ কাজে লাগানোর উদ্যোগ

  19. তিন বন্ধুর এই উদ্যোগের বিশেষত্ব হলো, আমের বিভিন্ন অংশকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্যিক পণ্য তৈরি করা। আম থেকে তৈরি হচ্ছে ড্রাই ম্যাংগো ও আমের পাউডার। আর ড্রাই ম্যাংগো তৈরির পর ফেলে দেওয়া খোসা ব্যবহার করা হচ্ছে ম্যাংগো পিল টি তৈরিতে।

  20. এতে একদিকে যেমন আমের অপচয় কমানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন পণ্য উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও বাড়ছে। স্থানীয়ভাবে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে আমের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করার এমন উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন এলাকার বাসিন্দারা।

  21. বজরাটেক গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আমের খোসা থেকে চা তৈরি করা হবে—এমন ধারণা তাদের কাছে একসময় অবিশ্বাস্য মনে হতো। কিন্তু এখন সেই খোসা থেকেই তৈরি হচ্ছে সুগন্ধিযুক্ত চা। তাদের মতে, উদ্যোগটি আরও সম্প্রসারিত হলে স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

  22. উদ্যোক্তাদের পাশে থাকার আশ্বাস কৃষি বিভাগের

  23. এ বিষয়ে ভোলাহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ সুলতান আলী বলেন, “আমের ফেলে দেওয়া অংশ থেকে তারা যে ম্যাংগো চা তৈরি করছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। আমরা এ ধরনের উদ্যোক্তাদের পাশে সবসময় আছি। তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করে আসছি। ভবিষ্যতেও প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া হবে। আমরা চাই, এ ধরনের আরও উদ্যোক্তা তৈরি হোক।”

  24. কৃষি কর্মকর্তার এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে নতুন উদ্যোগের প্রসার ঘটাতে সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

  25. বর্জ্য থেকে সম্ভাবনা, নতুন দৃষ্টান্ত তিন বন্ধুর

  26. আমের খোসা থেকে ম্যাংগো পিল টি তৈরির উদ্যোগটি শুধু একটি নতুন পণ্য উদ্ভাবনের গল্প নয়; এটি কৃষিপণ্যের অপচয় কমানো, স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার বাড়ানো এবং বিকল্প আয়ের পথ তৈরিরও একটি উদাহরণ।

  27. তিন বন্ধুর মেধা, শ্রম ও উদ্যোগী মনোভাব দেখিয়ে দিয়েছে, সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির ব্যবহার থাকলে অবহেলিত কৃষিজ উপাদান থেকেও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি করা সম্ভব। তবে পণ্যটির মান নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগার যাচাই এবং বাজার সম্প্রসারণ নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে এই উদ্যোগ আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

  28. চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের ঐতিহ্যকে কাজে লাগিয়ে বজরাটেকের তিন তরুণ উদ্যোক্তার এই প্রচেষ্টা স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে।

নিউজটি পোস্ট করেছেন : দৈনিক চেতনার কন্ঠ

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ