স্টাফ রিপোর্টার
খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলায় প্রকাশ্যেই চলছে পরিবেশ ধ্বংসের মহোৎসব। চাঁদখালি বাজার থেকে ধামরাইল পর্যন্ত প্রায় ২–৩ কিলোমিটার সড়কের পাশে গড়ে উঠেছে দুই থেকে আড়াই শতাধিক অবৈধ কয়লা ভাটি (চুলা)। কোনো অনুমোদন ছাড়াই নির্বিচারে গাছ কেটে কয়লা উৎপাদনের ফলে পুরো এলাকা এখন বিষাক্ত ধোঁয়ার চাদরে ঢাকা। শিশু, বৃদ্ধসহ সব বয়সী মানুষ চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়লেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই।
দিন-রাত কালো ধোঁয়ায় আকাশ ঢেকে থাকায় শ্বাস নেওয়াই কষ্টকর হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, শিশুদের হাঁপানি ও শ্বাসকষ্ট বেড়েছে, বয়স্করা ঘর থেকে বের হতে পারছেন না। চোখ জ্বালা, মাথাব্যথা, বমিভাব ও দীর্ঘস্থায়ী কাশিতে আক্রান্ত হচ্ছেন শত শত মানুষ। এক বাসিন্দা বলেন, “এখানে বসবাস মানে ধোঁয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করা।”
এই দূষণের প্রভাব সামাজিক জীবনেও মারাত্মক। একাধিক পরিবার জানিয়েছে, পরিবেশের ভয়াবহ অবস্থার কারণে বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন আসতে চান না। অনেকের মেয়েজামাই, নাতি-নাতনিরাও এই এলাকায় থাকতে অনিচ্ছুক। কেউ কেউ এলাকা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো বারবার অভিযোগের পরও প্রশাসনের নীরবতা। এলাকাবাসীর দাবি, স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরে একাধিকবার অভিযোগ দেওয়া হলেও রহস্যজনক কারণে কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। বরং অবৈধ ভাটির সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
অবাক করার মতোভাবে, কারখানার মালিকরাও অবৈধতার কথা স্বীকার করেছেন। কয়লা ভাটির মহাজন আবু সাঈদ ও মিঠুসহ কয়েকজন জানান, “এটা অবৈধ আমরা জানি। ধোঁয়ায় পরিবেশের বড় ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু বাবা-দাদার সময় থেকে করে আসছি, তাই আমরাও করছি।” তবে কারখানা বন্ধ করবেন কি না এ প্রশ্নে তারা কোনো স্পষ্ট উত্তর দেননি। তবে আবু সাঈদ বলেন ভিন্ন কথা, তিনি বলেন এটা ভেঙে দিলে আমাদের জন্যই সুবিধা।
আইন অনুযায়ী, অনুমোদনহীনভাবে গাছ কেটে কয়লা উৎপাদন পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও বন আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। তবুও শত শত অবৈধ ভাটি প্রকাশ্যে চলায় জনমনে প্রশ্ন উঠেছে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড কি প্রশাসনিক প্রশ্রয়ের ফল?
পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা অঞ্চলের উপপরিচালক মোঃ হারুন-অর-রশীদ বলেন, অনুমোদন ছাড়া কয়লা ভাটি পরিচালনা বেআইনি এবং পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে এলাকাবাসীর প্রশ্ন যেখানে চোখের সামনে শত শত অবৈধ কয়লা ভাটি জ্বলছে, সেখানে আর কত অভিযোগের পর প্রশাসন নড়বে?
ভুক্তভোগীদের দাবি, অবিলম্বে সব অবৈধ কয়লা ভাটি উচ্ছেদ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। নতুবা পাইকগাছার এই জনপদ ধীরে ধীরে বসবাসের অযোগ্য এলাকায় পরিণত হবে যার দায় এড়াতে পারবে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
দৈনিক চেতনার কন্ঠ