ঢাকা | বঙ্গাব্দ

অনিয়ম দুর্নীতির আরেক নাম এ.কে.এম আজাদ রহমান

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jan 19, 2026 ইং
অনিয়ম দুর্নীতির আরেক নাম এ.কে.এম আজাদ রহমান ছবির ক্যাপশন: দৈনিক চেতনার কন্ঠ
ad728
অনিয়ম দুর্নীতির আরেক নাম এ.কে.এম আজাদ রহমান
সরকারের সড়ক ভবনের নেতৃত্বে আজও সক্রিয় 'কাদের চক্র'। সংস্কারের নামে উল্টো চলছে আওয়ামী পন্থীদের পুনর্বাসন। সুকৌশলে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শেখ পরিবারের মদদপুষ্ঠ কর্মকর্তাদের।

প্রতিবেদক মোঃ সাইফুল ইসলাম। রংপুর

সদ্য পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার সর্বাধিক আলোচিত ও বিতর্কিত সিন্ডিকেট-‘কাদের চক্র’-এখনও সক্রিয় রয়েছে সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরে (সওজ)। সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনের অধিকাংশ দপ্তরে সংস্কারের হাওয়া বইলেও সওজে সেই হাওয়া পৌঁছায়নি। বরং, “সংস্কার” শব্দটিকে আড়াল বানিয়ে আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তাদের পুনর্বাসনের নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে সুকৌশলে। এ প্রক্রিয়ায় পুনর্বাসিত হচ্ছেন এমন বহু কর্মকর্তা যারা অতীতে রাজনৈতিক আনুগত্যের বিনিময়ে পদোন্নতি, বিদেশ সফর, আর্থিক সুবিধা এমনকি ট্রুথ কমিশনের মুখোমুখি হয়েও প্রশাসনিক সুরক্ষা পেয়েছিলেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এ.কে.এম আজাদ রহমান-যিনি ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিন সরকারের আমলে দুর্নীতি অনুসন্ধান কমিশনের (ট্রুথ কমিশন) মুখোমুখি হয়েছিলেন। অথচ আজও তিনি সরকারি যন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে বহাল আছেন।
সড়ক ভবনে আওয়ামী পুনর্বাসন মিশন : ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগে প্রশাসনিক সংস্কার কার্যক্রম শুরু হলেও সড়ক ভবনে উল্টোচিত্র দেখা গেছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরে আগের প্রভাবশালী চক্র—যারা “কাদের চক্র” নামে পরিচিত—তারা এখনো সক্রিয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রভাব বিস্তার করছে। বিশেষ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে একাধিক বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে দেখা গেছে আওয়ামী ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের পুনরায় নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। সর্বশেষ বদলি প্রজ্ঞাপনে আসলাম নামের এক কর্মকর্তাকে সরিয়ে তার স্থলে এ.কে.এম আজাদ রহমানকে ঢাকা জোনে পদায়ন করা হয়। যদিও প্রশাসনিক সূত্র বলছে, আজাদ রহমানের রাজনৈতিক পরিচয় বিএনপি ঘরানার, তবুও তিনি “সর্বোচ্চ আওয়ামী সুবিধাভোগী কর্মকর্তা” হিসেবে পরিচিত। কারণ, গত এক যুগে তিনি সওজের বিভিন্ন পদে থেকে সরকারের ঘনিষ্ঠ মহল ও সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন।
‘কাদের চক্র’-এর উত্থান ও টিকে থাকা : সওজের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তারা জানান, গত সাড়ে পনের বছরে ‘কাদের চক্র’ সড়ক উন্নয়ন খাতে অগণিত অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য, এবং ঠিকাদার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এক বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে তোলে। এই সিন্ডিকেট তিনস্তরে বিভক্ত- বদলি বাণিজ্য সিন্ডিকেট, অর্থপাচার সিন্ডিকেট, এবং প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ সিন্ডিকেট। প্রতিটি সিন্ডিকেটের সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেছেন প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা ইঞ্জিনিয়াররা। ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে এই সিন্ডিকেটের অংশ হিসেবে অন্তত ৩০ জন কর্মকর্তাকে বিদেশ সফরের অনুমতি দেওয়া হয়। প্রশাসনিক অনুমোদনের নামে ওই সফরগুলো ছিল অর্থ পাচারের সুপরিকল্পিত পথ—এমন অভিযোগ উঠেছে অভ্যন্তরীণ সূত্রে। বলা হচ্ছে, ওই সফরের মাধ্যমে সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং তার পরিবারের কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
আজও সক্রিয় ‘কাদের চক্র’ : সরকার পরিবর্তনের পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন, সওজে একটি প্রশাসনিক পুনর্গঠন হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে ঠিক উল্টোটা। এখনো বিভাগটির নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান, যিনি দীর্ঘদিন ধরে শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠ এবং আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। সড়ক বিভাগের একাধিক সূত্র জানায়, প্রধান প্রকৌশলী মঈনুলের নেতৃত্বে আওয়ামী ঘরানার কর্মকর্তারা এক নতুন কৌশল নিয়েছেন— “ঠিকাদার সঙ্কট” দেখিয়ে রাস্তাঘাটের রক্ষণাবেক্ষণে কৃত্রিম অব্যবস্থাপনা সৃষ্টি করা। এর উদ্দেশ্য, সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারবিরোধী অসন্তোষ সৃষ্টি করা এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বাড়ানো। সূত্রের দাবি, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মঈনুল হাসানই প্রধান কারিগর। তার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা আজাদ রহমানও এই চক্রের অন্যতম সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করছেন।
আওয়ামী ঘরানার প্রকৌশলী থেকে সিন্ডিকেট নেতায় মঈনুল হাসান : সওজের বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান কেবল প্রশাসনিক কর্মকর্তা নন—তিনি আওয়ামী রাজনীতির একজন সক্রিয় অংশীদার।
তিনি সেন্ট্রাল বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সদস্য, এবং ২০২২-২৩ সালের আইইবি (ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ) নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের “সবুর-মঞ্জুর প্যানেল” থেকে বিনাভোটে নির্বাচিত কাউন্সিল মেম্বার হন। তার আইইবি সদস্য নম্বর ১৪৫৫০ এবং ব্যালট নম্বর ছিল ১২১। এছাড়া তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। বুয়েটে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গেও সরাসরি জড়িত ছিলেন। তাকে একাধিকবার সরকারি কর্মচারীর দায়িত্বে থাকা অবস্থায় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা গেছে। মুজিব মাজারে কর্মকর্তা-সন্তানসহ পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ব্যাপক সমালোচনার মুখেও পড়েছিলেন তিনি। প্রশাসনিক সূত্র বলছে, মঈনুলের পরিবারের অনেক সদস্যও সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ফলে সরকার পরিবর্তনের পরও তিনি এখনও তার পদে বহাল থাকায় নতুন প্রশাসনের ভেতরে প্রশ্ন উঠেছে— “সড়ক ভবনের সংস্কার কি কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ?”
ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিন আমল থেকে আজকের সওজ : ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চলাকালে অসংখ্য আমলা ও রাজনীতিবিদ ট্রুথ কমিশনের মুখোমুখি হন। তাদের মধ্যে ছিলেন এ.কে.এম আজাদ রহমানও। তবে পরবর্তী সময়ে তিনি আবারও প্রশাসনে ফিরে এসে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়িত হন। তাকে ঘিরে একাধিক অভিযোগ উঠলেও প্রতিবারই রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কারণে তিনি রক্ষা পেয়েছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, আজাদ রহমানের মতো কর্মকর্তারা সরকারি যন্ত্রের অভ্যন্তরে “রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার” নামে এক প্রকার জোড়াতালি প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছেন, যা দুর্নীতি রোধের বদলে একে আরো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
সংস্কারের নামে প্রহসন : সরকারের একাধিক দপ্তরে যখন দুর্নীতি দমন, বদলি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক সংস্কারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে—তখন সওজে চলছে উল্টো প্রক্রিয়া। “সংস্কারের নামে পুনর্বাসন”-এমন অভিযোগ তুলেছেন বিভাগটির ভেতরের একাধিক কর্মকর্তা। তাদের ভাষায়, “আজকে যেসব কর্মকর্তা সংস্কারের নেতৃত্বে আছেন, তারাই গত সরকারের সময় দুর্নীতির শীর্ষে ছিলেন। তারা এখন নিজেদের রক্ষার জন্য নতুন প্রশাসনের কাছে নিজেদের অপরিহার্য করে তুলছেন।” বদলি প্রক্রিয়া, বিদেশ সফরের অনুমতি, এবং টেন্ডার অনুমোদন—সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে সেই পুরনো সিন্ডিকেট। সওজের গুরুত্বপূর্ণ জোনগুলোতে এখনও এমন কর্মকর্তাদেরই বসানো হয়েছে, যারা ওবায়দুল কাদের ঘনিষ্ঠ বা আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
কাদের পরিবারের টাকার গতি ও বিদেশ সফরের অজুহাত : দপ্তরের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ৫ আগস্টের পর হঠাৎ করেই ৩০ জন কর্মকর্তাকে বিদেশ সফরের অনুমতি দেওয়া হয়। সফরের গন্তব্য ছিল মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাই, ও যুক্তরাজ্য। দপ্তরের দাবি, সফরগুলো ছিল “প্রশিক্ষণ ও প্রকল্প অভিজ্ঞতা বিনিময় কর্মসূচি”; কিন্তু অর্থনৈতিক গোয়েন্দা ইউনিটের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন তথ্য—এই সফরগুলোর মাধ্যমে ওবায়দুল কাদেরের পরিবারের কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের এমন জালিকাবদ্ধ সিন্ডিকেট শুধু দুর্নীতিকে টিকিয়ে রাখে না, বরং পরিবর্তিত সরকারের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- সওজের “কাদের চক্র” এখন এমন একটি পরিকল্পনা করছে, যার মাধ্যমে দেশের সড়ক নেটওয়ার্কে ইচ্ছাকৃত অব্যবস্থাপনা ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা হবে। ঠিকাদার সঙ্কট, প্রকল্প বিলম্ব, এবং সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট অচল হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করে সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারের প্রতি অসন্তোষ ছড়ানোই এই চক্রের উদ্দেশ্য। এই চক্রের নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান। তার ডানহাত হিসেবে কাজ করছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এ.কে.এম আজাদ রহমান। নতুন সরকার প্রশাসনিক সংস্কারের অংশ হিসেবে দুর্নীতিবাজ ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত কর্মকর্তাদের অপসারণের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা সফল করতে হলে সওজের ভেতরের এই “গভীর প্রশাসনিক শিকড়” ছেঁটে ফেলা জরুরি। বিশ্লেষকদের মতে, “কাদের চক্র” শুধু একটি প্রশাসনিক সিন্ডিকেট নয়—এটি একটি রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক, যা আমলাতন্ত্র, ঠিকাদারি ব্যবসা, এবং বিদেশি লবিং-এই তিন স্তরে কাজ করে। একজন সাবেক সচিব মন্তব্য করেছেন- “যতদিন পর্যন্ত সওজের মতো দপ্তরে আজাদ-মঈনুলদের মতো কর্মকর্তা বহাল থাকবেন, ততদিন পর্যন্ত কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না।” সরকারি যন্ত্রে দলীয় আনুগত্য, প্রশাসনিক দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট সংস্কৃতি—এই তিন উপাদানই বাংলাদেশের সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আজও যখন দেশের সাধারণ মানুষ রাস্তাঘাটের বেহাল দশায় ভোগান্তি পোহাচ্ছে, তখন সেই সড়ক বিভাগেরই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নিজেদের অবস্থান রক্ষায় “রাজনৈতিক পুনর্বাসন” খেলায় ব্যস্ত। ফলত, প্রশ্ন উঠছে- ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিন আমলের ট্রুথ কমিশনে মুখোমুখি হওয়া যাদের জবাবদিহি হওয়ার কথা ছিল, তারা আজও যদি একই জায়গায় প্রভাব বিস্তার করে, তবে এই রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রকৃত সংস্কার কোথায়?

নিউজটি পোস্ট করেছেন : দৈনিক চেতনার কন্ঠ

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
ট্রাম্প ওয়াশিংটনে পৌঁছেছেন, প্রথম দিনেই সই করবেন রেকর্ডসংখ্য

ট্রাম্প ওয়াশিংটনে পৌঁছেছেন, প্রথম দিনেই সই করবেন রেকর্ডসংখ্য