ঢাকা | বঙ্গাব্দ

ইউএনও অফিসের হিসাব সহকারীর ওপর হামলার অভিযোগ মুক্তিযোদ্ধা আলমের বিরুদ্ধে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 8, 2026 ইং
ইউএনও অফিসের হিসাব সহকারীর ওপর হামলার অভিযোগ মুক্তিযোদ্ধা আলমের বিরুদ্ধে ছবির ক্যাপশন: দৈনিক চেতনার কন্ঠ
ad728
নিজস্ব প্রতিনিধি:

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ের হিসাব সহকারী ইসমাইল হোসেনের ওপর মুক্তিযোদ্ধা আলম মণ্ডল হামলা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। রোববার (৭ আগস্ট) বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলা পরিষদ ভবনের দ্বিতীয় তলায় হিসাব সহকারীর নিজ কক্ষে এ ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, দুইজন মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধার দাফন-কাফনের অনুদানের নতুন চেক হস্তান্তরের জন্য আসেন। এ সময় উপজেলা পরিষদ ভবনের তৃতীয় তলা থেকে দ্বিতীয় তলায় আসার পথে হিসাব সহকারী ইসমাইল হোসেনের সঙ্গে আলম মণ্ডলের দেখা হলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে ধমক-ধমকি দেন এবং হাতে থাকা লাঠি দিয়ে আঘাত করার পর তার কক্ষে প্রবেশ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় তিনি ইসমাইল হোসেনকে শুয়োরের বাচ্ছাসহ অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং সাত দিনের মধ্যে বদলি করার হুমকি দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

একপর্যায়ে ইসমাইল হোসেন এর প্রতিবাদ করলে আলম মণ্ডল তার হাতে থাকা কনুই লাঠি বা ক্রাচ দিয়ে ইসমাইলের কাঁধে দুইবার আঘাত করেন বলে অভিযোগ। এ সময় অফিসে উপস্থিত স্টাফ রোজিনা, মনিরসহ কয়েকজন ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেন বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে কয়েকজন কর্মচারীর সাথে কথা বলে সত্যতা জানা গেছে। ঘটনার বিষয়ে তারা ইউএনওকে অবগত করেছেন তিনি অফিস প্রধান হিসাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে আশা করেন।

অফিসের অন্য কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানালে তিনি সার বিক্রির ডিলার পয়েন্ট পরিদর্শনে মাঠে থাকায় আক্রান্ত হিসাব সহকারীকে নিরাপত্তার স্বার্থে ডাকবাংলোয় থাকার নির্দেশ দেন বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, অফিস কক্ষের বাইরে সিসি ক্যামেরা থাকলেও ভেতরে কোনো সিসি ক্যামেরা নেই। তাই কক্ষের ভেতরের ঘটনার কোনো ফুটেজ পাওয়া যাবে না। জানা গেছে, এর আগে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ওই দুই মৃত মুক্তিযোদ্ধার নামে ইস্যু করা চেক গ্রহণ করেছিলেন। তবে বর্তমানে তিনি প্যারালাইজড ও মানসিকভাবে অসুস্থ থাকায় চেক দুটির কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে আগের চেক দুটি বাতিল করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে নতুন চেক ইস্যু করা হয়।

ভুক্তভোগী হিসাব সহকারী ইসমাইল হোসেন বলেন, “আলম মণ্ডল দীর্ঘদিন ধরেই অফিসে কিংবা রাস্তায় দেখা হলে আমাকে কটু কথা বলে অপমান করতেন। আজ তিনি সরাসরি আমার কক্ষে ঢুকে গালিগালাজ করার পর ক্রাচ দিয়ে আমাকে আঘাত করেছেন। তিনি প্রায়ই অফিসে এসে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেন।” যেহেতু তিনি উপজেলা একটি দপ্তরে চাকরি করে তাই তিনি এর সঠিক বিচার চান।

ওয়েব তথ্য অনুযায়ী কুড়িগ্রাম জেলায় মোট বীর মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার। এর মধ্যে ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় ৯৩০ জন, কুড়িগ্রাম সদরে ৬২৯ জন, নাগেশ্বরীতে ৪৫০ জনের বেশি, উলিপুরে ৩৮০ জন, চিলমারীতে ৩৬২ জন, রৌমারীতে ৩০০ জনের বেশি, ফুলবাড়ীতে ২৫০ জনের বেশি, রাজারহাটে ২০০ জনের বেশি এবং চর রাজিবপুরে ১৫০ জনের বেশি বীর মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানা যায়, ভূরুঙ্গামারীতে এত বেশি মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তৈরি করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। মূল কাগজপত্র না থাকায় অন্যের কাগজপত্র কম্পিউটারে এডিট করে এসব তালিকা তৈরি করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের মূল কাগজপত্র যাচাই করলে সহজেই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা শনাক্ত করা সম্ভব। তারা বিভিন্ন সময় এসব ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার বিষয়ে অভিযোগ করলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তৈরির সঙ্গে উপজেলা ও জেলার বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী মুক্তিযোদ্ধা এবং মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কর্মকর্তা জড়িত বলেও অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কুড়িগ্রাম জেলায় কয়েক হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। এর মধ্যে ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন বলে বিভিন্ন সরকারি ও স্থানীয় সূত্রে তথ্য পাওয়া যায়। অন্যদিকে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, আলম মণ্ডল অতীতে স্থানীয় বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতেন। উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় ও ইউএনও কার্যালয়ে তার নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে বলেও তারা দাবি করেন।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত আলম মণ্ডলের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমার বিষয়ে তো কয়েকজন লিখছে। আমি কিছু বললে মুক্তিযোদ্ধা অফিসে সাংবাদিকদের বলব।”

এ বিষয়ে ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমৃত দেব নাথ বলেন, “ইসমাইলকে মারধরের ঘটনা শুনেছি। তবে এ ঘটনায় কোনো অভিযোগ বা মামলা হয়নি। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, আলম মণ্ডল উত্তেজিত হয়ে লাঠি দিয়ে গুঁতো দিতে দেখা গেছে।”

আলম মণ্ডলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, “কিছু অভিযোগ আমরা পেয়েছি। এ বিষয়ে একজন তদন্তকারী কর্মকর্তা রয়েছেন, তিনি তদন্ত করবেন। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তৈরির অভিযোগটি আমার জানা নেই। তবে কাগজপত্র নিজ দায়িত্বে রেখে না দেওয়ার বিষয়ে একটি অভিযোগ রয়েছে।”

সাধারণ মানুষ হলে এমন ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়া হলেও মুক্তিযোদ্ধা হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ইউএনও বলেন, “সার নিয়ে ব্যস্ত থাকায় জানা হয়নি। আমরা উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনব, আসলে কী হয়েছিল তা জানব। একজনের বক্তব্য শুনে কোনো মতামত দেওয়া ঠিক নয়।”

ঘটনার পর উপজেলা প্রশাসনিক ভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সরকারি কার্যালয়ে একজন কর্মচারীর ওপর হামলার অভিযোগের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

উল্লেখ্য, কয়েকমাস পূর্বে উপজেলা প্রকৌশলীকে তার অফিস কক্ষে স্থানীয় কয়েজন ব্যক্তির কথাকাটাকাটির ঘটনার তাদের বিরুদ্ধে জিডি দায়ের করা হয়েছিলো।



নিউজটি পোস্ট করেছেন : দৈনিক চেতনার কন্ঠ

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ