আকতারুজ্জামান, তানোর,রাজশাহী :
পরপর দুই মৌসুমের লোকসানে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তানোর উপজেলার আগাম আলু চাষীরা। ফলন তুলনামূলক ভালো হলেও বাজারদর একেবারে তলানিতে। কেজিপ্রতি মাত্র সাড়ে ৯ টাকায় আলু বিক্রি করতে হচ্ছে। তার ওপর প্রতি বস্তায় অতিরিক্ত ৫ কেজি করে ‘ঢলন’ দিতে বাধ্য হওয়ায় লোকসানের বোঝা আরও ভারী হয়ে উঠেছে।
সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে গোকুল মোড়ে দেখা যায়, ট্রাকে আলু লোড করছেন শ্রমিকরা। পাশে বস্তার ওপর বসে গালে হাত দিয়ে হতাশ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন কয়েকজন চাষী। আগাম জাতের আলু তুলে উৎপাদন খরচের অর্ধেক টাকাও তুলতে পারছেন না তারা। গত মৌসুমেও একইভাবে লোকসান গুনেছিলেন। ঘুরে দাঁড়ানোর আশায় বিলপাড়ের উঁচু জমিতে আবারও আগাম আলুর চাষ করেছিলেন অনেকে। কিন্তু লাভের আশা এবারও ধুলিসাৎ হয়েছে।
চাষী ফিরোজ জানান, এক বিঘা জমিতে আলু চাষে তার খরচ হয়েছে ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা। বিঘাপ্রতি ফলন হয়েছে প্রায় ৫০ বস্তা। প্রতিটি বস্তায় ৭০ কেজি আলু দিলেও দাম পাচ্ছেন ৬৫ কেজির। সাড়ে ৯ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে মোটে ২৫ থেকে ২৮ হাজার টাকা উঠেছে। অর্থাৎ বিঘাপ্রতি লোকসান ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা।
রইচ নামের আরেক চাষী জানান, সাড়ে তিন বিঘা জমির আলু একই দরে বিক্রি করেছেন। কুরবান জানান, আড়াই বিঘা জমির আলুও সাড়ে ৯ টাকায় ছাড়তে হয়েছে। তাদের ভাষায়, “বিঘায় ৫০ হাজার টাকা খরচ করে যদি ২৬-২৮ হাজার টাকা পাই, তাহলে পথে বসা ছাড়া উপায় কী?”
চাষীদের অভিযোগ, ৭০ কেজির বস্তা লোড হলেও ৬৫ কেজির দাম দেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রতি বস্তায় ৪৭ টাকা ৫০ পয়সা কম পাচ্ছেন। বিঘাপ্রতি প্রায় ২৫০ কেজি আলু বাড়তি দিতে হচ্ছে, যার মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ৩৭৫ টাকা। ঢলন না দিলে ব্যবসায়ীরা আলু কিনতে চান না।
এ বিষয়ে ব্যবসায়ী আইনুল বলেন, এসব আলু খুলনায় নেওয়া হবে। সেখানে গিয়ে কেজিতে এক থেকে দুই টাকা বেশি দামে বিক্রি সম্ভব। জমি থেকে কাঁচা আলু কিনতে হয়, পথে ও বাজারে অপেক্ষার সময় ওজন কমে যায়—এই যুক্তিতেই ঢলন নিতে হয় বলে দাবি করেন তিনি।
আরেক ব্যবসায়ী মাসুদ বলেন, “গতবারের মতো এবারও আলুতে ধরাসয়ী চাষীরা। বিঘায় ৫০ হাজার টাকা খরচ, বিক্রি করে পাচ্ছে ২৫-২৮ হাজার। কেউ কেউ ৩০ হাজার টাকারও বেশি লোকসান গুনছেন।”
মুনসুর জানান, গতবার ৮ বিঘা জমিতে চাষ করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এবার ৪ বিঘায় নামিয়ে এনেছেন। রাব্বানী ২৫ কাঠা জমির আলু তুলে একই দরে বিক্রি করেছেন বলেও জানান তিনি।
চাষীরা বলেন, এখনও পুরোদমে আলু তোলা শুরু হয়নি। আগে যারা রোপণ করেছিলেন, তাদের জমির আলু উঠছে। প্রায় ৮-১০ দিন আগে রহিমাডাঙ্গা বিল এলাকার আলু ওঠে, তখনও বাজারদর ছিল সাড়ে ৯ টাকা—এখনও সেই অবস্থাই চলছে। জমি লিজ ও বীজের দাম কিছুটা কম থাকলেও সার ও কীটনাশকের উচ্চমূল্যে উৎপাদন খরচ বেড়েছে।
সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে চাষীরা বলেন, নির্বাচনের সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের আশ্বাস দিয়েছেন। উত্তরাঞ্চলকে কৃষির রাজধানী করার কথাও বলা হয়েছে। এখন নতুন সরকারের কাছে তাদের প্রত্যাশা—অতিরিক্ত লাভ নয়, অন্তত উৎপাদন খরচটা যেন উঠে আসে।
উপজেলা কৃষি অফিসার সাইফুল্লাহ আহম্মেদ জানান, এ বছর উপজেলায় ১২ হাজার ১৯০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১৫০ হেক্টরের আলু তোলা হয়েছে। হেক্টরপ্রতি ফলন গড়ে ২৫ মেট্রিক টন। দামের বিষয়ে তিনি বলেন, কৃষি বিপণন বিভাগের দায়িত্ব বাজার তদারকি করা।
অন্যদিকে, কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগের উপপরিচালক (উপসচিব) শাহানা আখতার জাহানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
চাষীদের দাবি, বাজারে অন্যান্য সবজির দাম তুলনামূলক ভালো থাকলেও আলুর দর তলানিতে। তারা বলছেন, “আমরা উৎপাদন করছি বলেই মানুষ কম দামে আলু খেতে পারছে। কিন্তু এভাবে চললে হাজারো চাষী চাষাবাদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে।”